সর্বশেষ

সিলেট, জৈন্তাপুর

জৈন্তাপুরে অতিথি পাখি নিধন ও বিক্রয়ের মহা উৎসব

জৈন্তাপুরে অতিথি পাখি নিধন ও বিক্রয়ের মহা উৎসব

সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ঐতিহ্যের পরিচিতি বিশ্বখ্যাত। পান-সুপারি, স্বচ্ছ পানি, চা-বাগান, সারী নদীর সৌন্দর্য্য, তেল-গ্যাস, শ্রীপুর পাথর কোয়ারি, পিকনিক সেন্টার, গবেষণা কেন্দ্র গুলো পর্যটকদের মুগ্ধ করে। এছাড়া জৈন্তাপুরে রয়েছে প্রাচীন রাজপরিবারের দর্শনীয় স্থান, রয়েছে হাওর ও বিল। এর সাথে প্রতি বছর শীতে ছোট-বড় বিভিন্ন জলাশয়ে ও বৃক্ষে অতিথি পাখির দেখা মিলে। সেসব পাখির কলতালে এক অপার সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়। এসব দেখতে দেশের বিভিন্ন এলাকা এবং বিদেশ থেকে অনেক পর্যটক আসেন এ অঞ্চলে।


পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে; বিশেষ করে সাইবেরিয়া ও ইন্দুনেশিয়া থেকে এসব পাখি তীব্র শীত থেকে বাঁচার জন্য এখানে আসে। কিন্তু এক শ্রেণির অসাধু মানুষ টাকার লোভে সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এসব অতিথি পাখি শিকারে এবং বিক্রয়ের মহা উৎসব শুরু করে। ফলে একদিকে যেমন অতিথি পাখির বিচরণ কমছে অন্যদিকে পর্যটন শিল্পের ক্ষতি হচ্ছে।


পাখি এবং প্রকৃতি বিশেষজ্ঞদের মতে এ ভাবে অতিথি পাখি নিধন চলতে থাকলে একসময় এখানে আর অতিথি পাখির দেখা মিলবে না।
ভাদ্র মাস থেকে এখানে শীত মৌসুমে পাখির আগমন শুরু হয়। ভোর সকালে দেখা মিলে কুয়াশার। শীত শুরুর আগেই জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাটের বিভিন্ন হাওর এলাকায় ফাঁদ পেতে মানুষের মধ্যে বন্য প্রাণী ও অতিথি পাখি শিকারের উৎসব শুরু হয়। শিকারিরা পাখি শিকার করে বাজারে নিয়ে এসে চড়া দামে বিক্রি করে থাকে।


সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, জৈন্তাপুর উপজেলা দরবস্ত বাজার, হরিপুর বাজার, চিকনাগুল বাজার, চতুলবাজার, গোয়াইনঘাট উজেলার বিভিন্ন বাজারে অতিথি পাখি শিকার করে চোখ বেঁধে বা অন্ধ করে বিক্রি করতে বাজারে নিয়ে আসা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক জনের সাথে কথা বলে জানা যায় প্রতিনিয়তই বিভিন্ন ভাবে তারা ফাঁদ পেতে, কিংবা ছোট মাছের মধ্যে পটাশ মিশিয়ে ঝোঁপ-জঙ্গলে রেখে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি শিকার করছে।


এলাকাবাসী জানান, শীত মৌসুম শুরুর মাস খানেক আগে থেকেই জৈন্তার বিভিন্ন বিল ও হাওরে অতিথি পাখির আগমন শুরু হয়। আর তখন থেকেই শিকারিরা পাখি নিধনে ব্যস্ত হয়ে উঠে। তারা পাখি শিকার করে প্রকাশ্যে উপজেলার বিভিন্ন বাজারে চড়া মূল্যে এসব পাখি বিক্রি করছে। বিল এলাকায় ঘুরে কয়েকজন পাখি শিকারি নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ঝামেলা এড়াতে কোনো না কোনো ভাবে লিয়াজোঁ করে পাখি শিকার করেন তারা।


এছাড়া, স্থানীয় পাখি শিকারিদের পাশাপাশি শহর থেকে আসা সৌখিন পাখি শিকারিরাও যোগ দেন পাখি শিকারে। জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার বিল গুলোতে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি সহ আঞ্চলিক পাখি পাওয়া যায়। জৈন্তাপুরের ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে জৈন্তাপুর উপজেলার ৪নং দরবস্ত, ৫নং ফতেপুর ও জৈন্তাপুর ইউনিয়নে রয়েছে বেশ কয়েকটি হাওর। এগুলোর মধ্যে মেধল হাওর, কেন্দ্রী হাওর, ডিবির হাওর, বেদু হাওর, বড় হাওর, বুজি হাওর, ডেঙ্গার হাওর, চাতলারপাড় হাওর, গোয়ালজুরি, পুটিজুরি, বড়জুরি, ফাবিজুরি, গাছজুরি হাওর উল্লেখযোগ্য। শীত শুরুর আগে থেকে এই হাওর গুলোতে আগমন ঘটে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির। তার মধ্যে সামকুল, পাতিহাঁস, বালিহাঁস, ডাউক পাখি, অখা, সাদাবক ও কানাবকের বেশি আগমন ঘটে।


হরিপুর, চিকনাগুল ও দরবস্তের বাসিন্দারা বলেন- আমাদের এলাকায় বিভিন্ন উৎসবে, বিয়ে সাদিতে, এমনকি ছোট খাটো অনুষ্ঠানে পাখি না খাওয়ালে যেন উৎসবের অনন্দের ঘাটতি থেকে যায়। তাই এ অঞ্চলে পাখির চাহিদা একটু বেশি, এছাড়া বড় ধরনের পাখি পাওয়া যায়। এসব বাজারে পাখির চাহিদা থাকায় শিকারিরা বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে আসে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ম্যানেজ করে কিছু উসাধু ব্যবসায়ী শিকারিদের কাছ থেকে অল্প দামে পাখি সংগ্রহ করে চড়া দামে বাজারে বিক্রি করে।


বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন- সিলেটে শীতকালে মূলত পাখি শিকার হয়। এগুলো সিলেট মহানগরী সহ আশপাশের উপজেলার বাজার গুলোতে বিক্রি করা হয়। অনেক সময় প্রশাসনের নাকের ডগাতেই করা হয়। পাখি শিকারের আইন কার্যকর করতে প্রশাসনকে এগিয়ে আসতে হবে। যেসব এলাকায় পাখি শিকার করা হয় সেসব এলাকার তরুণ ও যুবসমাজকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অতিথি পাখি শিকার বন্ধ করতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
এবিষয়ে সারী বিট কর্মকর্তা আক্তার হোসেন প্রতিবেদককে জানান- পাখি শিকার বন্ধের বিষয় পরিবেশ অধিদপ্তরের। আমাদের কাজ নয়। তার পরেও আমাদের চোঁখের সামনে পড়লে আমরা ব্যবস্থা গ্রহন করি। অর্থের বিনিময়ে আপনারা শিকারিদের কোন বাঁধা কিংবা তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযান পরিচালনা করছেন না এমন প্রশ্ন œ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে জানান আপনাদের কাছে তথ্য থাকলে লেখা লেখি করেন। আমাদের জনবল কম থাকায় আমরা অভিযান পরিচালনা করি না।

মন্তব্য করুন